১৯৮৩ সালের নভেম্বরে প্রথম কোর্স শুরু করা অস্ট্রেলিয়ার প্রথম দিকের গোয়েঙ্কা-পরম্পরার কেন্দ্র… কোর্সের ব্যয় মেটানো হয় শুধু কোর্স সম্পন্নকারীদের অনুদানে

সিডনি থেকে ট্রেনে প্রায় দুই ঘণ্টা পশ্চিমে গেলে ব্লু মাউন্টেনের পাহাড়ি শহর ব্ল্যাকহিথে পৌঁছানো যায়। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত ব্লু মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কে ঘেরা এই শহরের স্টেশন থেকে হাঁটা দূরত্বে রয়েছে বিপাসনা ধ্যানকেন্দ্র ধম্ম ভূমি (Dhamma Bhūmi)। নামটির অর্থ ‘ধম্মের ভূমি’。
এখানে আয়োজিত কোর্সটি ১০ দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ। কোনো অংশগ্রহণ ফি নেই। থাকা, খাওয়া ও প্রশিক্ষণ—সবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়; পরিচালন ব্যয় মেটানো হয় শুধু কোর্স সম্পন্নকারীদের অনুদানে。
১৯৮১ সালে জমি কেনা, সাত মাসের মধ্যে প্রথম কোর্স

বিপাসনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (VRI) নথি অনুযায়ী, উদ্যোগটির শুরু ১৯৮০ সালে। মিয়ানমারে সায়াজি উ বা খিনের পরম্পরা গ্রহণ করা গোয়েঙ্কা (S. N. Goenka) ১৯৭৯ সাল থেকে ভারতের বাইরে কোর্স আয়োজন শুরু করেন। ১৯৮০ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় এসে সিডনি ও পার্থে কোর্স পরিচালনা করেন। ওই কোর্সে অংশ নেওয়া স্থানীয় সাধকদের মধ্যে একটি স্থায়ী কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়。
১৯৮১ সালে ব্ল্যাকহিথে জমি কেনা হয় এবং সাত মাস ধরে ব্যাপক নির্মাণকাজ চলে। ভিত্তি খোঁড়ার কাজও সহজ ছিল না। শীতের তীব্র ঠান্ডা ও বরফ নির্মাণকাজে বাধা দিয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রথম ভবন ছিল কাঠের ডরমিটরি ও ধ্যানকক্ষ। ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে প্রথম কোর্স অনুষ্ঠিত হয়。
এরপর ধাপে ধাপে সুবিধা বাড়ানো হয়। ১৯৮৬ সালে খাবারঘর ও রান্নাঘর সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৯০ সালে ৩৬টি ধ্যানকক্ষসহ একটি প্যাগোডা নির্মাণ শেষ হয়। ১৯৯২ সালে প্রথমবার ৩০ দিনের দীর্ঘ কোর্স চালু করা হলে আরও আবাসিক কক্ষ নির্মাণ করা হয়। ২০০০ সালে ২৫০ জনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ধ্যানকক্ষের নির্মাণ শেষ হয়। ২০০৭ সালে প্যাগোডার ওপরের তলায় আরও আটটি কক্ষ যুক্ত করা হয়。
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০৬৫ মিটার উঁচু পাহাড়ের কিনারায়, বিশ্ব ঐতিহ্যের বনে ঘেরা জমি

কেন্দ্রটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০৬৫ মিটার উঁচু পাহাড়ের কিনারায় অবস্থিত। এখান থেকে গ্রোস ভ্যালির বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়; চারদিক ঘিরে রয়েছে ব্লু মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্ক。
জমির আয়তন বিভিন্ন নথিতে সামান্য ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপাসনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নথিতে প্রায় ৩৮ একর এবং কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক ওয়েবপেজে ৪০ একর বলা হয়েছে。
কেন্দ্রের সুবিধার মধ্যে রয়েছে বড় ধ্যানকক্ষ ও প্যাগোডা, অভিজ্ঞ সাধকদের জন্য পৃথক ধ্যানকক্ষ, স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচালিত রান্নাঘর, একক কক্ষ ও যৌথ কক্ষসহ আবাসন এবং সেবাদানকারীদের জন্য আলাদা আবাসন। কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক ওয়েবপেজে বলা হয়েছে, বর্তমানে এখানে প্রায় ১০০ জন সাধককে গ্রহণ করা যায়。
ভোর ৪টায় শুরু হয় ১০ দিনের দিনযাপন

১০ দিনের কোর্সে প্রতিটি দিন দীর্ঘ। বিপাসনার আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, দিন শুরু হয় ভোর ৪টায় এবং শেষ হয় রাত ৯টা ৩০ মিনিটে। ভোর ৪টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ধ্যানকক্ষে বা নিজ নিজ কক্ষে ধ্যান করা হয়। এরপর খাবার, বিশ্রাম, দলগত ধ্যান ও বক্তৃতা পালাক্রমে চলে। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত শিক্ষকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সময় রাখা হয়。
কোর্স চলাকালে ‘মহৎ নীরবতা’ (Noble Silence) পালন করতে হয়। এতে শুধু কথার নয়, শরীর ও মনের নীরবতাও অন্তর্ভুক্ত। ইশারা বা চিরকুটসহ সব ধরনের যোগাযোগ নিষিদ্ধ; কেবল শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলা যায়। শেষ পূর্ণ দিনের সকাল পর্যন্ত এই নীরবতা বজায় থাকে。
কোর্স চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের অন্তত পাঁচটি শীল পালন করতে হয়। এগুলো হলো প্রাণহত্যা, চুরি, যৌন আচরণ, মিথ্যাচার এবং নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগলে অংশগ্রহণ না করাই ভালো। অর্থাৎ ধ্যানকে সব ধরনের অবস্থার জন্য প্রযোজ্য সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না。
কেন কোনো অংশগ্রহণ ফি নেই
কোর্সে কোনো অংশগ্রহণ ফি নেওয়া হয় না। বিপাসনার আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোর্সটি সম্পূর্ণভাবে অনুদানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়。
অনুদানের ক্ষেত্রেও নিয়ম রয়েছে। প্রথমবার অংশ নেওয়া কেউ কোর্স শেষ করার পর অনুদান দিতে পারেন। দশ দিন নিজে অভিজ্ঞতা নিয়ে এর মূল্যায়ন করা ব্যক্তিরাই পরবর্তী অংশগ্রহণকারীর জন্য অর্থ দেন। ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য কোর্সের ব্যয় মেটানোর জন্য অনুদান দেওয়ার সুযোগ শুধু কোর্স সম্পন্নকারীদেরই রয়েছে。
রান্নাঘরের দায়িত্ব নেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। আগে কোর্স শেষ করা ব্যক্তিরা ফিরে এসে খাবার প্রস্তুত করেন এবং কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা দেখাশোনা করেন—এই ব্যবস্থাই পরিচালন কাঠামোর ভিত্তি。

বাংলাদেশেও নয়, দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই পরম্পরার কেন্দ্র রয়েছে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই কাঠামোতে বিপাসনা কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। কোর্সের বিন্যাস, নিয়মকানুন এবং অংশগ্রহণ ফি না নেওয়ার পদ্ধতি—সব কেন্দ্রেই একইভাবে প্রয়োগ করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিচালিত কেন্দ্র ডিরেক্টরি (dhamma.org/en/locations/directory)-তে দেশভিত্তিক কেন্দ্র ও সময়সূচি দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত কোর্সগুলোর তথ্যও এই ডিরেক্টরিতে রয়েছে。
অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় বের করা কঠিন হলে দেশে বা কাছের এশীয় অঞ্চলের কোনো কেন্দ্রে আগে ১০ দিনের কোর্স করার পর ব্ল্যাকহিথের মতো ভিন্ন পরিবেশের কোনো কেন্দ্র বেছে নেওয়া যেতে পারে। কোর্সের বিষয়বস্তু একই হলেও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের কিনারা ও বিশ্ব ঐতিহ্যের বন—এই দুটি বৈশিষ্ট্য ধম্ম ভূমিতেই পাওয়া যায়。
কারা অংশ নিতে পারবেন
কেন্দ্রটি জানায়, ধর্ম, লিঙ্গ, জাতি বা জাতীয়তা নির্বিশেষে সবাইকে স্বাগত জানানো হয়। তবে আবেদন করার আগে নিয়মাবলি (Code of Discipline), কোর্সের চেকলিস্ট, কোর্সে কী প্রত্যাশা করা যায় সে-সংক্রান্ত নির্দেশিকা এবং কোর্সের অর্থায়ন সম্পর্কে ব্যাখ্যা পড়ে তা মেনে নিতে হবে。
আবেদনের ক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে। একসঙ্গে শুধু একটি কেন্দ্রের একটি কোর্সে আবেদন করা যায়। একাধিক কেন্দ্রে একই সময়ে আবেদন করে আসন আটকে রাখার প্রবণতা ঠেকাতেই এই নিয়ম。
নির্দেশনার ভাষা ইংরেজি। দশ দিন বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। তাই দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যেতে হলে যাতায়াতের দিনসহ প্রায় অন্তত দুই সপ্তাহ সময় হাতে রাখতে হবে。
যাতায়াত ও আবেদন পদ্ধতি

কেন্দ্রের ঠিকানা 212 Station Street, Blackheath NSW 2785। এটি সিডনির প্রায় ১১০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ট্রেনে যেতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিট। ব্লু মাউন্টেনস লাইন ধরে ব্ল্যাকহিথ স্টেশনে নেমে হেঁটেই কেন্দ্রে পৌঁছানো যায়। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পার্কিংয়ের জায়গা সীমিত; তাই সম্ভব হলে ট্রেনে আসতে হবে。
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রের বাইরে স্থান ভাড়া নিয়েও কোর্স আয়োজন করা হয়। ব্ল্যাকহিথের সময়সূচি সুবিধাজনক না হলে সেসব কোর্সের তারিখও দেখা যেতে পারে。
ধ্যানভ্রমণের কথা ভাবলে সাধারণত ভালো আবাসন ও সুচারুভাবে সাজানো কর্মসূচির কথাই মনে আসে। ধম্ম ভূমি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে কোনো ফি-তালিকা নেই, সুযোগ-সুবিধাও ন্যূনতম। দশ দিনের নীরবতা সহ্য করার প্রস্তুতি আছে—এমন মানুষের জন্যই এর দরজা খোলে। তবে সেই দোরগোড়া পেরিয়ে গেলে তার কাছ থেকে কোনো অর্থ চাওয়া হয় না。
আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট: https://bhumi.dhamma.org/
কোর্সের সময়সূচি: https://www.dhamma.org/en/schedules/schbhumi
আবেদন: https://bhumi.dhamma.org/apply-for-a-course
ফোন: +61 487 510 407
