অস্ট্রিয়ার টিরোলের ফার্নপাস (Fernpass) ইনসব্রুক থেকে উত্তর-পশ্চিমে এগিয়ে যাওয়া একটি পাহাড়ি পথ। গিরিপথ পার হওয়ার আগে শেষ দিকের যে গ্রামগুলোর একটি, সেটিই নাসেরাইথ (Nassereith)। অল্প জনসংখ্যার এই পাহাড়ি গ্রামের পেছনে পাথুরে পাহাড় খাড়া হয়ে উঠে গেছে। সেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছে ৫০০ বছরের পুরোনো একটি বাড়ি। এর নাম যোগা রিসোর্ট আলপেনরিট্রিট (Yoga Resort AlpenRetreat)।
পাহাড়ি পথের ধারে পুরোনো বাড়ি

ঠিকানা Fernpass 483, 6465 Nassereith। পুরোনো ভবন সংস্কার করে ব্যবহার করা হয়েছে বলে কক্ষের বিন্যাস প্রচলিত হোটেলের মতো নয়। এখানে ২০ বর্গমিটারের ডাবল রুমের পাশাপাশি নারী-পুরুষের জন্য আলাদা করে পরিচালিত ডরমিটরিও রয়েছে। বিছানার চাদর, তোয়ালে ও ঘরের ভেতর ব্যবহারের চপ্পল দেওয়া হয়; পার্কিং বিনা মূল্যে। রয়েছে বাগান ও পাঠাগার, আর পুরো ভবনটিই ধূমপানমুক্ত।
এ ধরনের বিন্যাস সাধারণত এমন জায়গায় দেখা যায়, যেখানে থাকার আরামের চেয়ে সাধনার নিবিড়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ঘরে দীর্ঘ সময় কাটানোর বদলে সারা দিন অনুশীলনের স্থান ও পাহাড়ি পথে সময় কাটানোই এখানে রীতি।
কী ধরনের সাধনা হয়

এখানে আয়োজিত রিট্রিট এক ধরনের নয়। ঋতুভেদে যোগ রিট্রিট, ধ্যান রিট্রিট, নীরবতা রিট্রিট, ক্রিয়া যোগ, বিপাসনা ধ্যান, নৃত্য ও শরীরচর্চার রিট্রিট, শ্বাসের অনুশীলন বা ব্রেথওয়ার্ক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ওয়েলনেস কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
যোগের ক্লাসে হঠ, ক্রিয়া, কুণ্ডলিনী, বিন্যাস ও প্রাণায়াম রয়েছে। ধ্যানের কর্মসূচিতে শ্বাসের ধ্যান (Atemmeditation) ও মাইন্ডফুলনেস ধ্যান (Achtsamkeitsmeditation) অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিছু সূচিতে চক্রকেন্দ্রিক সাধনার সঙ্গে কীর্তন বা চ্যান্টিংও রাখা হয়। যোগশিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স ও ধ্যান কর্মশালাও পরিচালিত হয়।
আলাদা করে নীরবতা রিট্রিট আয়োজনের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কথা না বলে কয়েক দিন কাটানোর এই বিন্যাস এশিয়ার বিপাসনা কেন্দ্রগুলোর পদ্ধতির কাছাকাছি। ইউরোপের যোগ রিসোর্টগুলোতে এমন কর্মসূচি নিয়মিত দেখা যায় না।

খাবার পুরোপুরি ভেগান
খাবারে কেবল উদ্ভিজ্জ উপকরণ ব্যবহার করা হয়; এটি সম্পূর্ণ ভেগান। ঋতুভিত্তিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়, আর অ্যালার্জি বা খাদ্য অসহিষ্ণুতা থাকলে খাবারে পরিবর্তন আনা সম্ভব। যারা ভ্রমণের গন্তব্য বেছে নেওয়ার সময় নিরামিষ বা ভেগান খাবারকে গুরুত্ব দেন, তাদের জন্য বিষয়টি আগে জেনে রাখা দরকার।
যেভাবে যাবেন

সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর ইনসব্রুক বিমানবন্দর; গাড়িতে যেতে প্রায় ৫০ মিনিট লাগে। মিউনিখ বিমানবন্দর থেকে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। ট্রেনে গেলে লেরমোস (Lermoos), এয়ারভাল্ড (Ehrwald) এবং ইমস্ট-পিৎসতাল (Imst/Pitztal) স্টেশনগুলো কাছাকাছি। আশপাশের শহরের মধ্যে জার্মানির ফ্যুসেন ও গার্মিশ-পার্টেনকির্শেন এবং অস্ট্রিয়ার রয়টে রয়েছে।
আবাসন কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দর থেকে যাত্রী আনার পরিষেবা দেয়। দূরত্ব অনুযায়ী এর ভাড়া ১৫ থেকে ১৪৫ ইউরো। বাংলাদেশ থেকে গেলে মিউনিখ বা ইনসব্রুকে পৌঁছে ভাড়া করা গাড়ি কিংবা ট্রেনে যাওয়াই বাস্তবসম্মত পথ। আল্পসের পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় শীতকালে রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি আগে জেনে নেওয়া ভালো।
বুকিং ও খরচ
আবাসন ও খাবারের মূল্য ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। কোর্সের ফি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে নগদে দিতে হয়। বুকিং নেওয়া হয় অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের (alpenretreat.com) বুকিং ফর্মের মাধ্যমে।
বাতিলের নিয়ম তুলনামূলক কঠোর। যাত্রার ৪ সপ্তাহ আগে বাতিল করলে ৫০ ইউরো ফি দিতে হয়। ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে বাতিল করলে অর্ধেক অর্থ ফেরত পাওয়া যায় না। যাত্রার ৩ সপ্তাহের মধ্যে বাতিল করলে কোনো অর্থই ফেরত দেওয়া হয় না।
অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট মূল্যতালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তৃতীয় পক্ষের বুকিং প্ল্যাটফর্ম ট্রিপ্যানিয়ার (Tripaneer)-এর তথ্য অনুযায়ী, এখানে আয়োজিত ৫ দিনের ধ্যান ও যোগ রিট্রিটের মূল্য ৯১০ মার্কিন ডলার থেকে শুরু। এই মূল্য প্ল্যাটফর্মের হিসাবে দেওয়া; কর্মসূচি ও সময়ভেদে তা পরিবর্তিত হতে পারে। সঠিক খরচ জানতে বুকিংয়ের আগে সরাসরি আবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করাই ভালো।
ধ্যানভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে অবস্থান

আল্পস এত দিন স্কি ও বিলাসবহুল স্পার জন্য পরিচিত ছিল। টিরোলের পাহাড়ি গ্রামে নীরবতা, ভেগান খাবার ও বিপাসনাকে এক জায়গায় নিয়ে আসা এই কেন্দ্র সেই প্রচলিত ধারার থেকে আলাদা। জাঁকজমকপূর্ণ সুবিধার ওপর নির্ভর না করে এখানে পুরোনো বাড়ি ও পাহাড়ি পথকেই ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউরোপে ওয়েলনেস ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে আল্পস অঞ্চল সাধারণত উচ্চমূল্যের রিসোর্টকেন্দ্রিক হয়। এর সঙ্গে এমন ছোট সাধনাকেন্দ্রও রাখলে বাজেট ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। অস্ট্রিয়াকে ধ্যানভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার সময় এটি বিবেচনার মতো একটি উদাহরণ।
