এজিয়ান সাগরের ব্যক্তিমালিকানাধীন দ্বীপে ছয়টি কক্ষ… এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোববার প্রবেশ, শনিবার প্রস্থান—সাপ্তাহিক পরিচালনা

গ্রিসের মূল ভূখণ্ড ও এভিয়া দ্বীপের মাঝামাঝি, এজিয়ান সাগরের উত্তরাংশে রয়েছে পরিচিতিহীন একটি ছোট দ্বীপ। এথেন্সের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন এই দ্বীপে 2013 সাল থেকে যোগা রিট্রিট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর নাম সিলভার আইল্যান্ড যোগা (Silver Island Yoga)।
পরিবারের বসতভিটেকে দুই বোন রিট্রিটে রূপান্তর করেছেন, পুরো দ্বীপটি সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানিতে চলে এবং একবারে সর্বোচ্চ ছয়টি কক্ষের সমানসংখ্যক অতিথি গ্রহণ করা হয়—ইউরোপের ওয়েলনেস রিট্রিটগুলোর মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য একে আলাদা করে তুলেছে।
পারিবারিক দ্বীপ থেকে রিট্রিট

সিলভার আইল্যান্ড যোগার প্রতিষ্ঠাতা দুই বোন ক্লেয়ার ক্রিস্টি (Claire Christie) ও লিসা ক্রিস্টি (Lissa Christie)। প্রতিষ্ঠানের সরকারি ওয়েবসাইটের বর্ণনা অনুযায়ী, পরিবারের বসবাসের দ্বীপটিকে স্বনির্ভর এবং প্রকৃতির ক্ষতি না করে পরিচালিত একটি ধ্যানকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার ভাবনা থেকেই তাদের যাত্রা শুরু। রিট্রিট পরিচালনা শুরু হয় 2013 সালে।
দ্বীপে রয়েছে পুরোনো জলপাইবাগান, যা এখনো জৈব পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সেন্ট কসমাস ও সেন্ট দামিয়ানোসের উদ্দেশে উৎসর্গ করা একটি ছোট গির্জাও টিকে আছে। এটি নতুন করে নির্মিত কোনো রিসোর্ট নয়; বরং মানুষ বসবাস করত এমন স্থান সংস্কার করে ব্যবহার করা হয়েছে—তার চিহ্ন সর্বত্রই রয়েছে।
60 একরজুড়ে জলপাইবন ও বাতিঘর
দ্বীপটির আয়তন প্রায় 60 একর। মৃদু ঢালু পাহাড় ও ছোট উপত্যকার পর পর বিস্তৃতি; সেখানে বেড়ে উঠেছে প্রাচীন জলপাইবন, সাইপ্রেসগাছ ও বুনোফুল। চারদিকেই এজিয়ান সাগর।
স্থাপনার বিন্যাস সরল। রয়েছে খোলা আকাশের নিচে যোগা শালা, মূল ভবন, কক্ষ ও বাথরুম, পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত, বাতিঘর এবং সূর্যাস্ত দেখার সময় ধ্যানের জন্য সানসেট রক। মোট কক্ষ ছয়টি। বেশির ভাগ কক্ষই টুইন বা ডাবল—দুইভাবেই ব্যবহার করা যায়। অতিথিরা এককভাবে থাকা, অন্য অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে থাকা অথবা পুরো কক্ষটি বুক করার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন।
রিট্রিট কেবল সাপ্তাহিক ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—রোববার প্রবেশ এবং শনিবার প্রস্থান। পরিচালনার মৌসুম এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

দিনে দুবার যোগা, দীর্ঘ বিকেল
দিন শুরু হয় সকালের যোগা দিয়ে। যোগা ঘরের ভেতরে নয়, সমুদ্র দেখা যায় এমন খোলা শালায় অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নবীন থেকে অভিজ্ঞ—সবার উপযোগী করতে বিভিন্ন ধরনের যোগা মিলিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা হয়।
সকালের ক্লাস শেষে থাকে নাশতা। দিনের বাকি সময় অতিথিরা নিজেদের মতো দ্বীপে হাঁটতে, সমুদ্রে নামতে বা বিশ্রাম নিতে পারেন। গির্জার ঘণ্টাধ্বনিতে দুপুরের খাবারের সময় জানানো হয়। সরকারি ওয়েবসাইটের ভাষায়, বিকেল রাখা হয় “সম্পূর্ণ বিশ্রামের অলস বিকেল” হিসেবে। সূর্য ঢলে পড়ার সময় দ্বিতীয় যোগা সেশন হয়। বিকেলের ক্লাস সকালের তুলনায় ধীরগতির এবং ধ্যাননির্ভর।
ঘন সময়সূচির নিবিড় অনুশীলন কোর্সের সঙ্গে এই রিট্রিটের ধরন আলাদা। এখানে নীরবতাকে কোনো নিয়ম হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয় না; দিনে দুই ক্লাসের মাঝখানে দীর্ঘ অবসর রাখা হয়। যোগা ও ধ্যানের সঙ্গে একেবারে নতুন যারা, তারাও অংশ নিতে পারেন।
সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানিতে দ্বীপের জীবন

দ্বীপের সব ব্যবস্থা পুরোপুরি নিজস্ব অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। দ্বীপের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই আলোর ব্যবস্থা করা হয়। শীতকালে পানি সংগ্রহ করে মজুত রাখা হয় এবং পুরো মৌসুমে তা ব্যবহার করা হয়।
বাথরুমে রাখা হয় জৈবভাবে পচনশীল পণ্য। পুনর্ব্যবহার করা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিও সরকারি ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
দিনে তিন বেলাই খাবার নিরামিষ। ভূমধ্যসাগরীয় রান্নার পদ্ধতিতে জৈব স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। ভেগান, গ্লুটেনমুক্ত ও ল্যাকটোজমুক্ত খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে।

আকার না বাড়ানো রিট্রিট
আবাসন ব্যবসার মানদণ্ডে ছয়টি কক্ষ অত্যন্ত ছোট পরিসর। রিট্রিট পরিচালনাকারীদের দিক থেকে দেখলে এটি এমন এক কাঠামো, যেখানে আয় বাড়ানো কঠিন। কক্ষের সংখ্যা বাড়ানোর বদলে পুরো একটি দ্বীপকে একইভাবে রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে পরিবারের বসতভিটেকে প্রকৃতির ক্ষতি না করে একটি স্থানে রূপ দেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যই কাজ করেছে বলে মনে হয়।
পানি ও বিদ্যুতের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও পরিসরের সঙ্গে যুক্ত। শীতকালে জমিয়ে রাখা বৃষ্টির পানিতে মৌসুম পার করতে হয় এবং সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করতে হয়। ফলে অতিথির সংখ্যা বাড়লেই দ্বীপের বাইরে থেকে সম্পদ আনতে হবে।
হিলিংনিউজ এর আগে অস্ট্রিয়ার আল্পসের পাদদেশে অবস্থিত আলপেন রিট্রিট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইউরোপের রিট্রিটগুলো একদিকে বড় ওয়েলনেস রিসোর্ট, অন্যদিকে ছোট স্বাধীন স্থাপনা—এই দুই ধারায় বিভক্ত। সিলভার আইল্যান্ড যোগা দ্বিতীয় ধারার অংশ। আড়ম্বরপূর্ণ স্থাপনা নয়, অতিথির সংখ্যা কমিয়ে জায়গার ঘনত্ব কম রাখাই এর পদ্ধতি।
কার জন্য উপযুক্ত
যারা এক সপ্তাহ সময় বের করতে পারেন এবং অনেক মানুষের রিসোর্টের বদলে অল্পসংখ্যক অতিথির জায়গা চান, তাদের জন্য এটি উপযোগী। ছয়টি কক্ষের কারণে প্রতিটি সেশনে থাকা অতিথির সংখ্যাও কম।
তবে যাওয়ার আগে কিছু বিষয় যাচাই করা জরুরি। এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন দ্বীপ হওয়ায় মাঝপথে বেরিয়ে আবার ঢোকা সহজ নয়। বিদ্যুৎ ও পানি নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় শহুরে আবাসনের মতো সুবিধা আশা করাও ঠিক হবে না। পরিচালনার মৌসুম এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি—ভ্রমণের পরিকল্পনায় এটিও আগে বিবেচনা করতে হবে।
পরিচালনার ভাষা ইংরেজি।
যাতায়াতের পথ
[ছবি: এভিয়া দ্বীপের উত্তরের ওরেই বন্দর ও ছোট নৌকা — গ্রিসের পর্যটন কর্তৃপক্ষ (visitgreece.gr)-এর প্রেস ছবি, Unsplash-এ “Oreoi Evia harbour boat” সার্চ]
সরকারি ওয়েবসাইটে যে পথের কথা বলা হয়েছে, তা হলো: প্রথমে এথেন্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এলেফথেরিওস ভেনিজেলোস) দিয়ে গ্রিসে প্রবেশ করতে হবে। এরপর একই সেশনের অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মূল ভূখণ্ড পেরিয়ে এভিয়া দ্বীপের উত্তরের ওরেই থেকে জল-ট্যাক্সিতে দ্বীপে যেতে হয়। দ্বীপে পৌঁছানোর শেষ অংশটি নৌপথে হওয়ায় আগমনের সময় রিট্রিট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে সময়সূচি পরিকল্পনা করলে
বাংলাদেশ থেকে এথেন্সে যাওয়ার পর আবার মূল ভূখণ্ড ধরে উত্তরে উঠে ওরেই থেকে নৌকায় যেতে হবে। ফলে যাতায়াতেই যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় দুই দিন লেগে যাবে। রোববার প্রবেশ ও শনিবার প্রস্থানের সাপ্তাহিক সূচি হওয়ায় মাঝপথে যোগ দেওয়া বা আগে বেরিয়ে আসা কঠিন। ছুটির পরিকল্পনায় রিট্রিটে ছয় রাতের সঙ্গে যাতায়াতের দিন যোগ করে অন্তত ১০ দিন সময় রাখা উচিত।
মৌসুম এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি সীমিত। গ্রীষ্মের ব্যস্ত মৌসুম এড়াতে চাইলে মে-জুন বা সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের সেশন আগে দেখে নেওয়া যেতে পারে। গ্রিস ও বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য গ্রীসে গ্রীষ্মকালীন সময় প্রযোজ্য কি না তার ওপর বদলে যায়, তাই যাত্রার আগে তা যাচাই করা ভালো।
খরচ ও যোগাযোগ
কক্ষের ধরন অনুযায়ী জনপ্রতি খরচ নির্ধারিত হয়। থাকা, খাবার ও যোগা ক্লাস—সবই অল-ইনক্লুসিভ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। এই প্রতিবেদন তৈরির সময় সরকারি ওয়েবসাইটের মূল্যতালিকার পেজে প্রবেশ করা যায়নি, ফলে নির্দিষ্ট খরচ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সঠিক মূল্য ও বুকিংয়ের শর্ত সরাসরি সরকারি ওয়েবসাইটে দেখে নিতে হবে।
সরকারি ওয়েবসাইট: https://www.silverislandyoga.com/
বুকিং ও যোগাযোগ: সরকারি ওয়েবসাইটের যোগাযোগ ফর্ম
পরিচালনার মৌসুম: এপ্রিলের মাঝামাঝি~অক্টোবরের মাঝামাঝি, রোববার~শনিবার সাপ্তাহিক সূচি
গ্রিস দ্বীপ ও সমুদ্রের দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও ধ্যান ও যোগার গন্তব্য হিসেবে দেশটিকে বাংলাদেশে খুব কমই তুলে ধরা হয়েছে। পরিসর বাড়ানোর বদলে একটি দ্বীপকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যবহার করা এই রিট্রিট ইউরোপের ওয়েলনেস ভ্রমণের আরেকটি দিক দেখায়।
