ভার্চুয়াল বাস্তবতায় নিজের অবতারকে দেখে আত্মমমতা ধ্যানের ফল… চোখ বন্ধ করে ধ্যানের চেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের গবেষকরা ধ্যানের অভিজ্ঞতাহীন ২৬ জন প্রাপ্তবয়স্ককে ১৭ মিনিটের আত্মমমতা ধ্যান করান… দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রতিক্রিয়ার সময় কমে ৬৮ মিলিসেকেন্ড

ভার্চুয়াল বাস্তবতার মধ্যে নিজের অবয়বের একটি অবতার দেখে আত্মমমতা ধ্যান করা ব্যক্তিরা চোখ বন্ধ করে একই ধ্যান করা ব্যক্তিদের তুলনায় অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে যাওয়ার কাজে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোসায়েন্স বিভাগের গবেষকদের পরিচালিত এই পরীক্ষার ফল ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক জার্নাল মাইন্ডফুলনেসে (Mindfulness) প্রকাশিত হয়েছে।

ধ্যানের অভিজ্ঞতাহীন ২৬ জনের তথ্য বিশ্লেষণ

গবেষকরা ৩০ জনকে নিয়োগ করে ২৬ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ ও ১৩ জন নারী ছিলেন। বয়স ২০ থেকে ৪৯ বছর, গড় বয়স ২৭.১৫ বছর (স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন ৮.১৫)। সবাই ছিলেন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক এবং তাঁদের ধ্যানের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। স্নায়বিক বা মানসিক রোগের পাশাপাশি মাদক অপব্যবহারের ইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হয়।

গবেষণাটি ছিল অংশগ্রহণকারীর অভ্যন্তরীণ তুলনাভিত্তিক নকশায়। একই অংশগ্রহণকারী উভয় শর্তে অংশ নেন, তবে শর্তগুলোর ক্রম এলোমেলোভাবে নির্ধারণ করা হয়। একটি ছিল অবতারভিত্তিক আত্মমমতা শর্ত, অন্যটি প্রচলিত আত্মমমতা শর্ত।

এআই-নির্মিত ছবি
এআই-নির্মিত ছবি

১৭ মিনিট রাতের আকাশের নিচে

উভয় শর্তেই প্রায় ১৭ মিনিটের অডিও-নির্দেশিত ধ্যান করানো হয়। স্বাগত পর্বের পর দৃশ্যপট বদলে রাতের আকাশের পরিবেশ তৈরি করা হয়। এরপর ৫ মিনিট শরীরের অনুভূতি ও শ্বাস-প্রশ্বাসে মনোযোগ দেওয়ার পর দুই শর্ত আলাদা হয়ে যায়।

প্রচলিত শর্তে চোখ বন্ধ রেখে নির্দেশিত ধ্যান চালিয়ে যেতে হয়। অবতার শর্তে অংশগ্রহণকারীরা চোখ খোলা রেখে এমন একটি অবতারের দিকে তাকান, যার নড়াচড়া তাঁদের নিজেদের নড়াচড়ার সঙ্গে সমন্বিত ছিল। এ সময় তাঁদের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলো জ্বলা-নেভার একটি উদ্দীপনাও দেখানো হয়। অর্থাৎ দৃষ্টিগত অনুভূতি ও হৃদস্পন্দনের অনুভূতিকে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়।

প্রযুক্তিগতভাবে ১০৭ ডিগ্রি দৃষ্টিক্ষেত্র এবং প্রতিটি চোখের জন্য ২১৬০×২১৬০ রেজোলিউশনের এইচপি রিভার্ব জি২ হেডসেট ব্যবহার করা হয়। কাইনেক্ট অ্যাজুরের চারটি ক্যামেরা দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের শরীর রিয়েল টাইমে স্ক্যান করে অবতার তৈরি করা হয়।

উভয় ক্ষেত্রেই আত্মমমতা বেড়েছে

স্টেট সেল্ফ-কমপ্যাশন স্কেল (এসএসসিএস; ১৮টি প্রশ্ন, ৫-পয়েন্ট স্কেল)-এ পরিমাপের সময়ের প্রধান প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল (χ²(2)=29.46, p〈0.001)। অবতার শর্তে প্রাথমিক মানের তুলনায় আত্মমমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে (t=6.68, p〈0.001, Cohen's d=0.94)। প্রচলিত শর্তেও একই ফল পাওয়া গেছে (t=5.53, p〈0.001, d=0.80)। দুই শর্তের পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না (p=0.25)।

নিজের ও অন্যের প্রতি চার ধরনের মৈত্রীভাব পরিমাপকারী এসওএফআই স্কেলে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের মান অবতার শর্তে সবচেয়ে বেশি ছিল (4.07)। এরপর ছিল প্রচলিত শর্ত (4.01) এবং প্রাথমিক মান (3.85)। নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের মানও অবতার শর্তে সবচেয়ে কম ছিল (1.44)।

দৃষ্টিভঙ্গি বদলের কাজেই পার্থক্য স্পষ্ট

দুই শর্তের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায় ‘নিজের শরীরের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের কাজ (ওবিটি)’-এ। এতে সামনে বা পেছনমুখী একটি মানুষের ছবি ২০০ মিলিসেকেন্ড দেখিয়ে চিহ্নিত হাতটি বাঁ হাত না ডান হাত, তা নির্ধারণ করতে বলা হয়। মোট ১৯২টি পরীক্ষার মাধ্যমে অন্যের শরীরে নিজেকে কল্পনায় স্থানান্তর করার ক্ষমতা মাপা হয়।

অবতার শর্তে প্রতিক্রিয়ার সময় গড়ে ৬৮.২৪ মিলিসেকেন্ড কমেছে (t(25)=-4.33, p=0.002, Cohen's d=-0.85)। প্রচলিত শর্তে কমার পরিমাণ ছিল ২৩.৩৯ মিলিসেকেন্ড, যা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না (p=0.28)। দুই শর্তের সরাসরি তুলনাতেও অবতার শর্তে কমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল (χ²(1)=10.53, p=0.001)। নির্ভুলতার ক্ষেত্রে শর্তভেদে কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম দিয়ে মাপা হৃদস্পন্দনের মধ্যবর্তী সময়, হৃদস্পন্দনের হার এবং হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনশীলতায় দুই শর্তের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।

দৃষ্টিভঙ্গি বদলের সক্ষমতায় অবতার শর্ত এগিয়ে

গবেষকরা বলেন, বহু-ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধির সংকেত দৃষ্টিভঙ্গি বদলকে সহায়তা করার পাশাপাশি নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল সম্পৃক্ততাও বাড়াতে পারে। পরীক্ষাটির মূল ফল হলো, উভয় ধরনের ধ্যানই আত্মমমতা বাড়িয়েছে, তবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের সক্ষমতায় অবতার শর্ত এগিয়ে ছিল।

গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। নমুনা ছিল মাত্র ২৬ জনের, আর জাতি, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও আর্থসামাজিক মর্যাদার তথ্য পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহ করা হয়নি। গবেষণাটি আগাম নিবন্ধিতও ছিল না। অংশগ্রহণকারীদের কারও ধ্যানের অভিজ্ঞতা না থাকায় নিয়মিত ধ্যানচর্চাকারীদের ক্ষেত্রেও একই ফল হবে কি না, তা জানা যায় না। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে আত্মমমতা স্কেলের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যও তুলনামূলকভাবে কম ছিল (McDonald's ω=0.64)।

এটি একবারের ১৭ মিনিটের সেশনে দেখা স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তন—বিষয়টি মাথায় রেখেই ফল পড়তে হবে। দেশেও ভিআর-ভিত্তিক ধ্যানের কর্মসূচি বাড়ছে। তাই কোন উপাদান কার্যকারিতা তৈরি করে, তা চিহ্নিত করার এমন পরীক্ষা আরও সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

#ভিআরধ্যান #আত্মমমতা #মাইন্ডফুলনেস #ভার্চুয়ালবাস্তবতা #দৃষ্টিভঙ্গিবদল #ধ্যানগবেষণা #আন্তর্জাতিকগবেষণা #ডিজিটালধ্যান