পাথরে খোদাই করা হুয়ায়েনের পথে ধ্যানের পদচারণা, ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর

পাথরে খোদাই করা হুয়ায়েনের পথে হাঁটা, ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর

মধ্য জাভার মাগেলাংয়ে অষ্টম-নবম শতকে নির্মিত বিশাল স্তূপ… ওপরের অংশে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১,২০০ জন প্রবেশ করতে পারেন; নির্দিষ্ট স্যান্ডেল পরে গাইডের সঙ্গে উঠতে হয়।

মধ্য জাভায় ভোর নামে কুয়াশার চাদর মুড়ে। মেরাপি আগ্নেয়গিরির দিক থেকে নেমে আসা হালকা বাষ্প মাঠ ঢেকে রাখে। তার ওপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি কালো অবয়ব—পাথর সাজিয়ে তৈরি ধাপওয়ালা পাহাড়, যাকে বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ নিদর্শন বলা হয়, সেই বোরোবুদুর।

এখানে আসা মানুষ সাধারণত স্থাপনাটিকে নয়, মনে রাখেন নিজের পদচারণাকে। কারণ বোরোবুদুর ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখার কোনো স্তূপ নয়; ঘুরে ঘুরে ওপরে ওঠার এক পথ।

নিচের স্তরে কামনা, ওপরের স্তরে নিরাকার শূন্যতা

বোরোবুদুর গঠিত ছয়টি বর্গাকার টেরেস ও তিনটি বৃত্তাকার প্রাঙ্গণ নিয়ে। এই কাঠামো বৌদ্ধ বিশ্বতত্ত্বের তিন স্তরকে হুবহু প্রতিফলিত করে।

সবচেয়ে নিচে কামধাতু—কামনার জগৎ। বর্তমানে এটি ভিত্তির আড়ালে দেখা যায় না। তার ওপর রয়েছে রূপের জগৎ রূপধাতু। চার স্তরের বর্গাকার টেরেসের দেয়ালে খোদাই করা আছে প্রায় ২,৬৭২টি ভাস্কর্যফলক। দেয়াল ধরে হাঁটলে ফলকগুলো গল্পের ধারাবাহিকতা মেনে সামনে এগিয়ে যায়।

আরও সিঁড়ি পেরিয়ে ওপরে উঠলে আকৃতি মিলিয়ে যায়। এটি অরূপধাতু, নিরাকার জগৎ। দেয়াল বা ভাস্কর্যফলক কিছুই নেই; কেবল বৃত্তাকার প্রাঙ্গণ, আর আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ভেতর দেখা যায় এমন ঘণ্টার আকৃতির ৭২টি স্তূপ। পুরো মন্দিরে রয়েছে ৫০৪টি বুদ্ধমূর্তি, প্রতিটির হাতের মুদ্রা আলাদা।

কামনা থেকে রূপে, রূপ থেকে নিরাকারে। তীর্থযাত্রী এই ক্রমটি পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন।

আগ্নেয় ছাইয়ে চাপা পড়ে ফিরে আসা মন্দির

বোরোবুদুর অষ্টম থেকে নবম শতকের মধ্যে শৈলেন্দ্র রাজবংশের আমলে নির্মিত হয়। পরে দীর্ঘ সময় আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে বিস্মৃত ছিল। উনিশ শতকে এটি আবার আবিষ্কৃত হয়।

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ইউনেস্কোর সহায়তায় পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারকাজ শুরু হয়। প্রতিটি পাথর খুলে নথিবদ্ধ করে আবার সাজিয়ে বসানোর বিশাল কর্মযজ্ঞ ছিল এটি। ১৯৯১ সালে বোরোবুদুর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

ওপরের অংশে উঠতে আগে থেকে বুকিং করতে হয়

এখন বোরোবুদুরে আসা ভ্রমণকারীদের প্রথমেই জানা উচিত, মন্দিরের ওপরের অংশে প্রবেশ সীমিত। পাথরের সিঁড়ির ক্ষয় কমাতেই এই ব্যবস্থা।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ওপরের অংশে ওঠার অনুমতি প্রতিদিন ১,২০০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সময়ভিত্তিক স্লট আগে থেকে বুক করতে হয়। পর্যটন মৌসুমে ১–২ সপ্তাহ আগে বুকিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সোমবার ওপরের অংশ বন্ধ থাকে, তবে পার্ক খোলা থাকে।

সরকারি বুকিং পেজ অনুযায়ী, মন্দিরের স্থাপনা দেখার সময় শুরু হয় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে। প্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রস্তুতির সময় বিবেচনায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে পৌঁছানোর নির্দেশনা রয়েছে।

ওপরের অংশের টিকিটে মন্দিরের স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি, রিস্টব্যান্ড টিকিট, ‘উপানাত’ নামে পরিচিত বিশেষ স্যান্ডেল এবং ট্যুর গাইডের সঙ্গ অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন পাথর রক্ষার জন্য তৈরি বোনা স্যান্ডেল উপানাত পরা বাধ্যতামূলক। গাইড ছাড়া একা ওঠা যায় না।

বুকিং করতে হবে borobudurpark.com-এ। যোগাযোগ করা যাবে হোয়াটসঅ্যাপে (+62811 2688 000) অথবা ই-মেইলে (info@injourneydestination.id)।

মেন্দুত ও পাউনের সংযোগরেখা

শুধু বোরোবুদুর দেখে ফিরে এলে জাভার এই ঐতিহ্যের অর্ধেকই দেখা হয়। কাছেই একই সময়ে নির্মিত মেন্দুত মন্দির ও পাউন মন্দির রয়েছে। তিনটি মন্দিরই একটি সরলরেখায় অবস্থিত। তাই প্রাচীনকাল থেকেই তীর্থযাত্রীরা মেন্দুত থেকে যাত্রা শুরু করে পাউন পেরিয়ে বোরোবুদুরে পৌঁছাতেন।

আরও কিছুটা এগোলে রয়েছে হিন্দু মন্দির প্রামবানান ও বৌদ্ধ মন্দির সেউ। কাছাকাছি সহাবস্থান করা দুই ধর্মের স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে জাভার ধর্মীয় ইতিহাস এক জায়গায় দেখা যায় এখানে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিদেশিদের জন্য সমন্বিত টিকিট ২০২৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিটি মন্দিরের জন্য আলাদা টিকিট কিনতে হয়।

বারান্দার দেয়ালে খোদাই করা সাধনার কাহিনি

রূপধাতুর বারান্দার ভাস্কর্যগুলো নিছক অলংকার নয়—এই উপলব্ধিই মন্দিরটি বোঝার চাবিকাঠি। বপো শিনমুন বোরোবুদুরকে ‘পাথরে খোদাই করা হুয়ায়েন সূত্র’ বলে অভিহিত করেছে। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বারান্দায় হুয়ায়েন সূত্রের ৫৩ জন জ্ঞানগুরুর কাহিনি খোদাই করা আছে। জ্ঞানপ্রাপ্তির সন্ধানে সুধনকুমার যে ধারাবাহিকভাবে ৫৩ জন গুরুর কাছে গিয়েছিলেন, এটি সেই যাত্রার কাহিনি।

কাহিনির কাঠামো আর ভবনের কাঠামো একে অপরের ওপর মিলে যায়। সুধনকুমার যে ক্রমে গুরুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তীর্থযাত্রীও সেই ক্রম ধরে বারান্দা প্রদক্ষিণ করেন। সেই পদচারণা শেষ হলে তিনি নিরাকার স্তরে উঠে যান। প্রতিটি ভাস্কর্য ধরে পড়তে গেলে অর্ধেক দিনও যথেষ্ট নয়। তবে কয়েকটি দৃশ্য মনে রেখে ধীরে হাঁটলেও এই মন্দির কী বলতে চেয়েছিল, তা অনুভব করা যায়।

হাজার প্রদীপ আকাশে ওঠে যে বৈশাখের রাতে

বছরের মধ্যে বৈশাখ উৎসবের দিনই বোরোবুদুর সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ একসঙ্গে স্মরণ করা এই দিনে হাজারো ভক্ত ও ভ্রমণকারী জড়ো হন। তাঁরা পবিত্র আগুনের শোভাযাত্রা করেন এবং রাতের আকাশে হাজার হাজার প্রদীপ উড়িয়ে দেন।

শোভাযাত্রা মেন্দুত থেকে শুরু হয়ে বোরোবুদুরের দিকে যায়। দিনের দর্শনের তুলনায় রাতের এই সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ তৈরি করে।

যে কাঠামোয় হাঁটাই সাধনায় পরিণত হয়

বোরোবুদুরে কোনো উপাসনাকক্ষ নেই। ভেতরে ঢুকে সামনে বসে প্রার্থনা করার মতো কোনো স্থান শুরু থেকেই তৈরি করা হয়নি।

তার বদলে রয়েছে দেয়াল। ভাস্কর্য অনুসরণ করে ডান দিকে ঘুরে একেকটি স্তর পেরিয়ে ওপরে ওঠার সময় দৃষ্টি স্থির থাকে দেয়ালে, পা থামে না। কাঠামোটিই যেন হাঁটা-ধ্যানের অনুরূপ। গতি ধীর করে শ্বাস-প্রশ্বাস সামলে নিলে ভাস্কর্যের দৃশ্য বদলে যাওয়ার ছন্দের সঙ্গে পদচারণার ছন্দ মিলে যায়।

ওপরের অংশে উঠলে দেয়াল অদৃশ্য হয়ে যায়। চারদিক খুলে যায়, চোখে পড়ে কেবল দূরে সারি বেঁধে থাকা পাহাড় আর আকাশ। নির্মাতার উদ্দেশ্য যা-ই হয়ে থাকুক, এই কাঠামোর ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ শেষ স্তরে এসে কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

কীভাবে যাবেন এবং কখন যাবেন

সবচেয়ে কাছের প্রধান শহর যোগ্যাকার্তা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, সেখান থেকে মন্দিরে গাড়িতে যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট লাগে। ঠিকানা: Jl. Badrawati, বোরোবুদুর, মাগেলাং, মধ্য জাভা।

নভেম্বর থেকে পরের বছরের মার্চ পর্যন্ত বর্ষাকাল। তাই মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ভেজা পাথরের সিঁড়ি পিচ্ছিল হয়ে যায়, ফলে ওপরের অংশ দেখা কঠিন হয়। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের প্রথম সময়সীমা বেছে নিলে দুপুরের আর্দ্রতা ও ভিড় এড়ানো যায়।

প্রবেশপথ থেকে পার্কিং এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার পথ স্মারকের বাজারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়—ভ্রমণসূচি তৈরির সময় এটিও বিবেচনায় রাখা ভালো।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যাওয়ার পথ

দক্ষিণ কোরিয়ার বৌদ্ধ মহলেও বোরোবুদুরকে তীর্থস্থান হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে। আজেতুর ১০ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ রাত ৬ দিনের ‘হুয়ায়েন মহাস্তূপ বোরোবুদুর & জাকার্তা তীর্থযাত্রা’ পরিচালনা করছে। ভ্রমণটি শুরু হবে যোগ্যাকার্তা থেকে, সেখান থেকে যাত্রীরা জাকার্তায় যাবেন।

সূচিতে রয়েছে বোরোবুদুরের বারান্দায় খোদাই করা হুয়ায়েন সূত্রের ৫৩ জ্ঞানগুরুর ভাস্কর্য দেখা, পাউন ও মেন্দুত মন্দির, প্রামবানান ও সেউ মন্দির এবং মেরাপি আগ্নেয়গিরিতে জিপ ভ্রমণ। জাকার্তায় পুরোনো শহর, জাতীয় জাদুঘর, ইস্তিকলাল মসজিদ ও মোনাস ঘুরে দেখা হবে।

ওঠার আগে যা জানা দরকার

পাথরের সিঁড়ি খাড়া এবং সরু। হাঁটুতে সমস্যা থাকলে কোথায় হাতল রয়েছে, তা আগে দেখে নেওয়া ভালো; লাঠির বদলে সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিশেষ স্যান্ডেল ঘটনাস্থলেই দেওয়া হয়। পায়ের সামনের অংশ চওড়া হলে স্যান্ডেল পরতে সময় লাগতে পারে, তাই হাতে কিছুটা অতিরিক্ত সময় নিয়ে যাওয়া ভালো। জাভার দুপুরের রোদ বেশ তীব্র। টুপি ও পানি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।

মন্দিরটি এখনও উপাসনার স্থান। বিশেষ করে বৈশাখ উৎসবের সময় সাধকেরা সেখানে থেকে সাধনা করেন। ভাস্কর্য স্পর্শ করা বা স্তূপের ওপর ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ধ্যানভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে বোরোবুদুর

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধ্যানভ্রমণের গন্তব্যের কথা উঠলে সাধারণত বালি ও চিয়াং মাইয়ের নাম আগে আসে। কারণ সেখানে রিট্রিট সেন্টার বেশি এবং কর্মসূচিও সুসংগঠিত।

বোরোবুদুরের অভিজ্ঞতা আলাদা। এখানে কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেই; আছে স্থাপনাটি নিজেই। এক হাজার বছর আগে মানুষ যে পথ দিয়ে জ্ঞানপ্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে পাথরে অনুবাদ করে রেখেছিল, আজকের ভ্রমণকারী নিজের পায়ে সেই পথ আবার অতিক্রম করেন। ধ্যান শিখতে যাওয়ার জায়গার চেয়ে বরং ধ্যান কোন দিকে নিয়ে যায়, তা শরীর দিয়ে অনুভব করার স্থান এটি।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে জাভায় যাওয়ার পথ ছোট নয়। তাই প্রামবানান, মেরাপি এবং যোগ্যাকার্তার রাজপ্রাসাদকেন্দ্রিক সংস্কৃতিও ভ্রমণসূচিতে মিলিয়ে অন্তত পাঁচ দিনের পরিকল্পনা করা ভালো।

প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ: fare3041@naver.com