গর্ভাবস্থাকে জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় বলা হয়। তবে আগে বিষণ্নতায় ভোগা নারীদের কাছে এই সময়ের চিত্রটা অন্য রকমও হতে পারে। শরীর, হরমোন, ঘুম আর দৈনন্দিন জীবন—সব একসঙ্গে ওলটপালট হয়ে যাওয়ায় কমে আসা বিষণ্নতা আবার ফিরে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের গবেষক দল ঘরে বসে ব্যবহার করা যায় এমন বিনামূল্যের অনলাইন মাইন্ডফুলনেস কর্মসূচি এই পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করেছে। ফলাফল ২০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী Lancet Public Health-এ প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৫০০ গর্ভবতী নারী, ঘরে বসে ৮টি সেশন
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের রেনি ক্রাউন ওয়েলনেস ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সোনা দিমিদজিয়ান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের সেন্টার ফর উইমেন’স মেন্টাল হেলথের ডা. লি কোহেন। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকে ৫০০ জন গর্ভবতী নারী এতে অংশ নেন। তাঁদের সবারই একাধিকবার বিষণ্নতায় ভোগার ইতিহাস ছিল এবং তাঁরা সম্প্রতি বা তখন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ খেয়েছিলেন; তবে গবেষণায় যোগ দেওয়ার সময় তাঁরা বিষণ্নতায় ভুগছিলেন না। তাঁদের গড় বয়স ছিল ৩২ বছর, আর গর্ভাবস্থার সময়কাল ছিল প্রায় ১১ সপ্তাহ।
অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেক প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি ১২ সপ্তাহ ধরে Mindful Mood Balance for Moms নামের একটি অনলাইন কর্মসূচি ব্যবহার করেন। বাকি অর্ধেক শুধু প্রচলিত চিকিৎসা নেন। কর্মসূচিটি ছিল আটটি সেশনের ওয়েবভিত্তিক মাইন্ডফুলনেস কগনিটিভ থেরাপি; এতে ছিল অডিও নির্দেশনায় অনুশীলন, ভিডিও এবং একই পরিস্থিতির মায়েদের ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ। এতে নবজাতকের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি মাইন্ডফুলনেস চর্চা, নিজেকে দোষারোপ করা চিন্তার জবাবে নিজের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং বিষণ্নতার প্রাথমিক লক্ষণ চিনে নিয়ে তা মোকাবিলার পরিকল্পনা করার কৌশল শেখানো হয়।
সন্তান জন্মের পর ৬ মাসে পুনরাবৃত্তি: ৪৪% বনাম ৩৩%
গবেষক দল সন্তান জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত বিষণ্নতার পুনরাবৃত্তি হয়েছে কি না, তা অনুসরণ করে। কর্মসূচির দলে ২৪৯ জনের মধ্যে ৮১ জনের (৩৩%) বিষণ্নতা ফিরে আসে। প্রচলিত চিকিৎসার দলে ২৫১ জনের মধ্যে ১১১ জনের (৪৪%) পুনরাবৃত্তি হয়। পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি হিসেবে হিসাব করলে কর্মসূচির দলে তা ২৬% কম ছিল (ঝুঁকি অনুপাত ০.৭৪)।
১২ সপ্তাহের কর্মসূচি চলাকালীন কর্মসূচির দলে বিষণ্নতার উপসর্গের তীব্রতাও বেশি কমেছিল। তবে সন্তান জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত পুরো সময় হিসাব করলে দুই দলের উপসর্গের পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না। অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা গেলেও কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর উপসর্গের স্কোরের পার্থক্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে।
ওষুধ বন্ধ করার পরামর্শ নয়
এই ফলাফল বোঝার সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। দুই দলেরই অংশগ্রহণকারীদের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ গবেষণার পুরো সময় অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ খেতে থাকেন। এই কর্মসূচি ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি; বরং প্রচলিত চিকিৎসা ও ওষুধের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি প্রতিরোধমূলক উপায় হিসেবে যুক্ত হয়েছিল। কর্মসূচিটির নির্মাতারাও বলেছেন, এটি ইতিমধ্যে শুরু হওয়া গর্ভকালীন বা প্রসবোত্তর বিষণ্নতার চিকিৎসার জন্য নয়, বরং পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য। ওষুধ চালিয়ে যাওয়া ও কমিয়ে আনা—এই দুই অবস্থার পার্থক্য ভবিষ্যৎ গবেষণার বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
অধ্যাপক দিমিদজিয়ান জোর দিয়ে বলেন, গর্ভবতী নারী ও নতুন মায়েদের হাতে বিকল্প থাকা দরকার। গবেষক দলের মতে, অধিকাংশ গর্ভবতী নারী ওষুধের চেয়ে কাউন্সেলিংভিত্তিক চিকিৎসা চান, আর প্রায় অর্ধেক গর্ভাবস্থায় ওষুধের মাত্রা কমান বা বন্ধ করেন। কাউন্সেলিং নিতে চাইলেও খরচ, যাতায়াত এবং বিশেষজ্ঞের অভাব বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গবেষক দলের ভাষ্য, ঘরে বসে নিজের সুবিধামতো সময়ে ব্যবহার করা যায় এমন বিনামূল্যের কর্মসূচি এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। চলমান ওষুধের মাত্রা পরিবর্তনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

চিকিৎসার পাশাপাশি ধ্যানের ভূমিকা
এই গবেষণা দেখায়, ধ্যানের অবস্থান কোথায় হওয়া উচিত। মাইন্ডফুলনেস চিকিৎসক ও ওষুধকে সরিয়ে দেওয়ার বিকল্প নয়; বরং চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ সময়টা সামলে নিতে সাহায্য করে এমন দৈনন্দিন অনুশীলন হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। গর্ভের আকার বাড়তে থাকা এবং ঘুম বারবার ভেঙে যাওয়ার সময় ধ্যানকেন্দ্রে যাওয়া সহজ নয়। শিশু ঘুমিয়ে থাকলে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে কয়েক মিনিট করে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া—এটাই বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই একটি পথ।
নিজের প্রতি সহমর্মিতা এবং বিষণ্নতার প্রাথমিক লক্ষণ চিনে নেওয়ার মতো কর্মসূচির বিষয়গুলো মায়েদের নিজেদের যত্ন নেওয়ার কৌশলও শেখায়। আগে বিষণ্নতায় ভুগে থাকলে, অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিজের উপযোগী মানসিক যত্নের উপায় আগে থেকেই খুঁজে রাখা ভালো। ধ্যান মানে একা একা সব সহ্য করার কথা নয়; সাহায্য নিতে নিতে নিজের মনের খোঁজ রাখার শক্তি গড়ে তোলা।
প্রতিবেদন সংক্রান্ত যোগাযোগ: fare3041@naver.com
