দৈনন্দিন জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে কোথাও গিয়ে থাকা—এমন রিট্রিট এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণকারীদের ওয়েলনেস খরচের তালিকায় শীর্ষে। রিট্রিট বুকিং প্ল্যাটফর্ম বুকরিট্রিটস ১৬ অক্টোবর হালনাগাদ করা ‘স্টেট অব রিট্রিটস ২০২৬’ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রিট্রিট ভ্রমণে আগ্রহী ১,০৪০ জন মার্কিন ভ্রমণকারীর মধ্যে ৪৯% আগামী ১২ মাসে রিট্রিটে অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এই হার স্পা ও ওয়েলনেস চিকিৎসার (৪৫%) এবং পুষ্টি-পরিপূরক ও ভিটামিনের (৪৪%) চেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, এক বছর আগের তুলনায় ধ্যান রিট্রিটে আগ্রহ ৪৪% বেড়েছে।

উত্তরদাতাদের ৬৪% ইতিমধ্যে সময়সূচি ঠিক করেছেন, তবে জরিপটি হয়েছে শুধু রিট্রিটে আগ্রহীদের মধ্যে
পরিসংখ্যান বোঝার আগে জরিপটির ধরন জানা দরকার। রিট্রিট বুকিংয়ের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান ও বুকিং-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে অনলাইন জরিপের ফল মিলিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। জরিপটি চলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এতে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী এমন ব্যক্তিরা, যারা রিট্রিট ভ্রমণে আগ্রহী এবং পরিবারের ভ্রমণ-পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক জনগণের মতামত নয়; বরং রিট্রিটে আগে থেকেই আগ্রহী ব্যক্তিদের উত্তর। পাশাপাশি, প্রতিবেদনটি শিল্পখাতের একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি—এ বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে ফলাফল পড়া উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবণতাটি স্পষ্ট। উত্তরদাতাদের ৬৪% এ বছর রিট্রিটের সময়সূচি ইতিমধ্যে ঠিক করে রেখেছেন। প্রজন্মভিত্তিক হিসাবে, জেনারেশন এক্সের ৭৩%, জেনারেশন জেডের ৬৮% এবং মিলেনিয়ালদের ৬৬% বলেছেন, আগামী ১২ মাসে তাঁরা রিট্রিটে যাবেন। ওয়েলনেস খাতে খরচের পরিকল্পনায় রিট্রিট (৪৯%)-এর পর রয়েছে স্পা ও ওয়েলনেস চিকিৎসা এবং পুষ্টি-পরিপূরক। জিম ও ব্যায়াম স্টুডিওর সদস্যপদের ক্ষেত্রে হার ৩৬%, আর মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৩৪%। ওয়েলনেস ডিভাইসের ক্ষেত্রে তা ১৪% এবং অ্যাপের সাবস্ক্রিপশনে ১২%। পর্দার ভেতরের সেবার চেয়ে কোথাও গিয়ে শরীরসহ অবস্থান করে অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী উত্তরদাতার সংখ্যাই বেশি।

বিশ্রাম চান ৬২%, বার্নআউট কাটিয়ে উঠতে চান ৩৫%; শরীরনির্ভর রিট্রিটে আগ্রহ দ্বিগুণেরও বেশি
মানুষ কেন রিট্রিটে যান, তাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। বিশ্রাম ও শিথিলতা সবচেয়ে বেশি—৬২%। এরপর মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য ৩৭%, জমে থাকা চাপ ও বার্নআউট কাটিয়ে উঠতে ৩৫%, এবং শারীরিক স্বাস্থ্য ও সক্ষমতার জন্য ১৭%। প্রকৃতির সঙ্গে আবার সংযোগ স্থাপনের ইচ্ছার কথাও বলেছেন ২৫% উত্তরদাতা।
ধ্যান এখন ভ্রমণের কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারজন ভ্রমণকারীর একজন বলেছেন, ভ্রমণের সময় ধ্যান থাকা জরুরি। ৩২% বলেছেন, তাঁরা যেখানেই থাকুন, ধ্যানের জন্য আলাদা সময় রাখেন। ধ্যানে আগ্রহী ভ্রমণকারীদের ৫৭% বলেছেন, বাড়ির বাইরে ধ্যান করতে হলে অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে রিট্রিট বেছে নেবেন। জেনারেশন জেডের ৫৯% বলেছেন, ভ্রমণের সময় ধ্যান তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষভাবে নজর কাড়ে শরীরকেন্দ্রিক কর্মসূচির প্রসার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করার ওপর জোর দেওয়া ‘নার্ভাস সিস্টেম রিসেট’ রিট্রিটে ২০২৩ সালের পর থেকে আগ্রহ বেড়েছে ১০৫%। শরীরের অনুভূতির মধ্য দিয়ে টানটান ভাব কমানোর ‘সোমাটিক থেরাপি’ একই সময়ে বেড়েছে ১৪১%। এটিকে সবচেয়ে দ্রুত প্রসারমান ওয়েলনেস কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাউন্ড হিলিংও বেড়েছে ৮৬%। যোগ রিট্রিট খোঁজা মানুষের ৪২% বলেছেন, তাঁরা যোগের সঙ্গে সার্ফিং বা হাইকিংয়ের মতো অন্য কার্যক্রমও রাখতে চান। চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণের অনুশীলনের চেয়ে শরীর নাড়িয়ে, অনুভব করে ধ্যানে প্রবেশের চাহিদা বাড়ছে—এ প্রবণতার ইঙ্গিত মিলছে এতে।

ধর্মীয় পরিচয় না থাকলেও নীরবতা খুঁজছেন অনেকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাধনাকেন্দ্রে বাড়ছে মানুষের ভিড়
এই প্রবণতা শুধু শিল্পখাতের প্রতিবেদনেই দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় প্রবণতাবিষয়ক সংবাদপত্র ‘রিলিজিয়ন ওয়াচ’-এর সংকলন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন পোস্ট গত বছরের সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিল, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন ও ইহুদিসহ বিভিন্ন ধারার নেতারা নীরবতা রিট্রিটে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ার কথা বলেছেন। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেরই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছিল না। নেতারা এর কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারির রেখে যাওয়া অস্থিরতা, প্রযুক্তিতে ক্লান্তি এবং শোকের কথা উল্লেখ করেছেন।
কলোরাডোর তিব্বতি বৌদ্ধ সাধনাকেন্দ্র দ্রালা মাউন্টেন সেন্টার সদস্যদের কাছে জানতে চাইলে ৪৬% (১০৮ জন) নীরবতা রিট্রিটে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পেনসিলভানিয়ার ইরিতে বেনেডিক্টাইন সিস্টারহুড ১৯৮০-এর দশক থেকে নীরবতা রিট্রিটের আয়োজন করছে। সেখানে সাধারণত প্রায় ১৫ জন অংশ নিলেও আগস্টে অংশগ্রহণকারী বেড়ে ২৯ জনে দাঁড়ায়; তাঁদের মধ্যে তরুণের সংখ্যাও ছিল বেশি। অনেকেই ইন্টারনেট ও টেলিভিশন না থাকার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। এক সন্ন্যাসিনী বলেন, এই পরিবর্তনে নীরবতা ও আত্মজিজ্ঞাসার আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

প্রতি চারটি বুকিংয়ের একটিই জলবায়ুবান্ধব রিট্রিট; অঞ্চলভেদে খরচে প্রায় সাত গুণ ফারাক
বুকরিট্রিটস জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের রিট্রিট বুকিংয়ের ২৭% ছিল জলবায়ুবান্ধব রিট্রিট—২০২৪ সালের তুলনায় এই হার ২২% বেড়েছে। উত্তরদাতাদের ৮৭% বলেছেন, টেকসই ভ্রমণ গুরুত্বপূর্ণ; আর ৮১% বলেছেন, উদ্দেশ্যপূর্ণ ভ্রমণ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
খরচের পার্থক্যও বড়। যুক্তরাষ্ট্রে রিট্রিটের গড় দাম হাওয়াইয়ে সবচেয়ে বেশি—৩,০৫৩ ডলার। ইলিনয়ে তা ৪৪৬ ডলার; দুই অঞ্চলের দামে ৬.৮ গুণ ফারাক। উইসকনসিন (৪৯৭ ডলার) ও আলাবামার (৫৯১ ডলার) মতো জায়গায় খরচ ৫০০ ডলারের আশপাশে। অর্থাৎ, বিশ্রাম নিতে গেলে যে বেশি দামের জায়গায় যেতেই হবে, তা নয়।

পাহাড়ি মন্দির বা বনে এক রাত: নিজের জন্য উপযুক্ত রিট্রিট বেছে নেবেন যেভাবে
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণকারীরা অর্থ খরচ করে যে অভিজ্ঞতা নিতে যান, তার কাছাকাছি সুযোগ দক্ষিণ কোরিয়াতেও রয়েছে। পাহাড়ি মন্দিরে এক রাত কাটানোর টেম্পলস্টে, জাতীয় বন-চিকিৎসাকেন্দ্রের বনভিত্তিক কর্মসূচি, কিংবা ধ্যানকেন্দ্রের কয়েক দিনের নিবিড় কোর্স—সবই রিট্রিটের বিভিন্ন ধরন। নভেম্বরের টেম্পলস্টে ও বনে হ্যামকে ধ্যানের খবর নিয়ে সম্প্রতি ‘হিলিং নিউজ’-এর প্রতিবেদনেও যেমন উঠে এসেছে, বড় অঙ্কের খরচ বা দীর্ঘ বিমানযাত্রা ছাড়াই পৌঁছানো যায় এমন জায়গা কম নয়। কোরিয়ার পাহাড়ি মন্দিরের শান্ত একটি দিন বিদেশি পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত; বিশ্বে কোরীয় ধ্যানচর্চার পরিচিতি ছড়ানোর পথও হতে পারে এটি।
কার জন্য কোন রিট্রিট উপযুক্ত, তা ব্যক্তি ভেদে আলাদা। কারও কাছে মোবাইল ফোন সরিয়ে রেখে নীরবে দিন কাটানোর নীরবতা রিট্রিট স্বস্তিদায়ক; আবার কারও জন্য দীর্ঘ সময় বসে থাকা কঠিন। তথ্যের চাপে ক্লান্ত মনকে আগে বিশ্রাম দিতে চাইলে হাঁটতে হাঁটতে ধ্যান, যোগ বা বনের পথে হাঁটার মতো শরীরচর্চা মেশানো কর্মসূচি দিয়ে শুরু করা সহজ। দিনের সময়সূচিতে বসে ধ্যান ও নড়াচড়ার মধ্য দিয়ে ধ্যান কীভাবে ভাগ করা হয়েছে, মোবাইল ব্যবহারের নিয়ম কী, এবং প্রশিক্ষকের অভিজ্ঞতা কেমন—আগে থেকে দেখে নিলে নিজের উপযোগী জায়গা বেছে নিতে সুবিধা হয়। রিট্রিট শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার সময়, তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়। বিষণ্নতা বা উদ্বেগে দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে উঠলে আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

প্রতিবেদনসংক্রান্ত যোগাযোগ: fare3041@naver.com
