ভিক্টোরীয় যুগের ফায়ার স্টেশন এখন ধ্যানকেন্দ্র… লন্ডনের ইস্ট এন্ডের লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্র

লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্র
লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্র

লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের বেথনাল গ্রিনে রোমান রোড ধরে হাঁটলে অলংকরণে সমৃদ্ধ লাল ইটের একটি ভবন চোখে পড়ে। ১৮৮৮ সালে নির্মিত এই ভবনটি ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের ফায়ার স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখন প্রতিদিন দুপুর ১টায় মানুষ এখানে এসে এক ঘণ্টা ধ্যান করেন। কোনো বুকিং বা অংশগ্রহণ ফি নেই। ১৯৭৮ সাল থেকে লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্রের এটাই পরিচিত দৃশ্য।

ধ্যানকেন্দ্র বললে অধিকাংশ মানুষ পাহাড় বা সমুদ্রতীরের কথা ভাবেন। এই কেন্দ্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশে অবস্থিত—লন্ডনের ইস্ট এন্ডের একেবারে কেন্দ্রে, যেখানে পাশাপাশি রয়েছে মেট্রো স্টেশন, বাজার ও ক্যাফে। কর্মস্থল থেকে হেঁটে এসে দুপুরের বিরতিতে ধ্যান করে আবার অফিসে ফিরে যাওয়াই এখানে স্বাভাবিক রীতি।

ফায়ার স্টেশন থেকে ধ্যানকক্ষ, দুই দফায় রূপান্তর

ভবনটির ইতিহাসে দুবার বড় মোড় এসেছে। প্রথমটি ১৯৬৯ সালে, যখন ফায়ার স্টেশন হিসেবে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়। এরপর ১৯৭০-এর দশকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভবনটি কিছু সময় পরিত্যক্ত ছিল। দ্বিতীয় রূপান্তর ঘটে স্বেচ্ছাসেবকেরা ভবনটি কিনে নিজেদের হাতে সংস্কার করার পর। আগুনে পুড়ে যাওয়া ফায়ার স্টেশনটিকে মানুষ যেন আবার দাঁড় করিয়েছিল। কেন্দ্রটি ১৯৭৮ সালে চালু হয়।

২০০৯ সালে ভবনটিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। তখন বেসমেন্টে ধ্যান ও ক্লাসের জন্য ‘ব্রিদিং স্পেস’ নামে একটি আলাদা স্থান তৈরি হয়। বর্তমানে ভবনের ভেতরে রয়েছে ধ্যানকক্ষ, বুদ্ধমূর্তি স্থাপিত দুটি প্রার্থনাকক্ষ, একটি লাইব্রেরি, বইয়ের দোকান এবং আবাসিক সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা।

কেন্দ্রটি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের নিবন্ধিত একটি দাতব্য সংস্থা। এর নিবন্ধন নম্বর ২৫৫৪২০। ধ্যান ও বৌদ্ধ শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এটি মাইন্ডফুলনেসভিত্তিক কগনিটিভ থেরাপি বা এমবিসিটি কর্মসূচিও পরিচালনা করে।

লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্র
লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্র

কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ে আবদ্ধ নয় আধুনিক বৌদ্ধধারার ত্রিরত্ন

লন্ডন বৌদ্ধ কেন্দ্র ত্রিরত্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লন্ডনভিত্তিক কেন্দ্র। ১৯৬৭ সালে লন্ডনে সংঘরক্ষিত—যাঁর আসল নাম ডেনিস ফিলিপ এডওয়ার্ড লিংউড—‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ওয়েস্টার্ন বুদ্ধিস্ট অর্ডার’ বা এফডব্লিউবিও নামে এই সম্প্রদায়টি শুরু করেন। ২০১০ সালের বসন্তে সংগঠনটি বর্তমান নাম গ্রহণ করে।

ত্রিরত্ন কোনো নির্দিষ্ট বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। থেরবাদ, মহাযান ও বজ্রযানের বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আধুনিক জীবনের উপযোগী পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়াই এর পথ। এটিকে ইংরেজিভাষী বিশ্বের বৌদ্ধ আধুনিকতাবাদের একটি ধারা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

এর পরিসরও ছোট নয়। ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২০টি দেশে প্রায় ১,৫০০ জন আনুষ্ঠানিক সদস্য ছিল। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও ওশেনিয়াকে কেন্দ্র করে ১০০টিরও বেশি সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী কার্যক্রম চালায়। সবচেয়ে বড় ভিত্তি ভারতে। সর্বশেষ সদস্যসংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

দুই ধরনের সাধনাই মূল ভিত্তি

এই কেন্দ্রে শেখানো মৌলিক সাধনা মূলত দুই ধরনের: শ্বাসের প্রতি মননশীলতা বা মাইন্ডফুলনেস অব ব্রিদিং (আনাপানসতি) এবং মৈত্রীভাবনা (মেত্তা ভাবনা)।

প্রথমটি হলো শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার প্রবাহের দিকে মনোযোগ রাখার অনুশীলন। দ্বিতীয়টির অর্থ পালি ভাষায় মৈত্রী বা সদয় মন গড়ে তোলা। এতে প্রথমে নিজের প্রতি, পরে ঘনিষ্ঠ মানুষ, নিরপেক্ষ মানুষ এবং কঠিন সম্পর্কের মানুষের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ধীরে ধীরে প্রসারিত করা হয়। শিক্ষানবিশদের ক্লাস থেকে বহু বছর ধরে সাধনা করা ব্যক্তিদের সমাবেশ—সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রটি এই দুই অনুশীলনকে অভিন্ন ভিত্তি হিসেবে ধরে।

আকর্ষণীয় বিষয় হলো, মৈত্রীভাবনাকে সরাসরি কেন্দ্র করে আলাদা একটি কোর্সও চালু রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় কোর্সটির নাম ‘মেত্তা ভাবনাকে কে অপছন্দ করে (Who Hates the Metta Bhavana?)’। মৈত্রীভাবনা বাস্তবে অনুশীলন করতে গিয়ে অস্বস্তিকর ও কৃত্রিম মনে হয়—সাধকদের এই সৎ প্রতিক্রিয়াকেই শিরোনামে তুলে ধরা হয়েছে।

বুকিং ছাড়াই অংশ নেওয়া যায় বিনা মূল্যের ক্লাসে

সাপ্তাহিক অধিকাংশ কর্মসূচিতে বুকিংয়ের প্রয়োজন নেই, অংশগ্রহণ ফিও নেওয়া হয় না। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর কেন্দ্রটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সূচিটি এমন।

সোমবার থেকে শনিবার প্রতিদিন দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত মধ্যাহ্ন ধ্যান অনুষ্ঠিত হয়। সব পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীদের জন্য উন্মুক্ত এই ক্লাসটি বিনা মূল্যের, তবে অনুদান গ্রহণ করা হয়। সন্ধ্যায় মঙ্গলবার রাত ৭টা ১৫ মিনিট থেকে ৯টা ১৫ মিনিট এবং বুধবার একই সময় থেকে রাত ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ধ্যানের সমাবেশ থাকে। শনিবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট এবং পরে দুপুর ১টা থেকে ২টা—দুই দফায় কর্মসূচি চলে।

ধ্যানের বাইরের কর্মসূচিগুলোও দিনভিত্তিক ভাগ করা। সোমবার সন্ধ্যায় বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা নিয়ে ক্লাস হয়, যেখানে ১১ পাউন্ড অনুদান দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বুধবার সকালেও একই ধরনের ক্লাস থাকে। বুধবার বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা মন্ত্রোচ্চারণের সময় নির্ধারিত, সেখানে ৭ পাউন্ড অনুদান দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধ্যান ও আলোচনাভিত্তিক সমাবেশ এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় গল্প ও আচারকেন্দ্রিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ছয় সপ্তাহের প্রাথমিক কোর্স ও রিট্রিট

যাঁরা কাঠামোবদ্ধভাবে শিখতে চান, তাঁদের জন্য কয়েক সপ্তাহব্যাপী কোর্সও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বৌদ্ধধর্ম ও ধ্যানের প্রাথমিক পরিচয়’ কোর্সটি। সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিট থেকে রাত ৯টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ছয় সপ্তাহ ধরে এটি চলে। কোর্স ফি ১৩০ পাউন্ড। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ফি ৮৫ পাউন্ড এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের জন্য ৬৫ পাউন্ড। আয়ের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের বাধা কমবেশি রাখা হয়েছে।

শিক্ষানবিশদের জন্য ‘ধ্যানের ভিত্তি’ কোর্সটি ২০২৬ সালের ১০ থেকে ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। আগে উল্লেখ করা মৈত্রীভাবনা কোর্সে সরাসরি অংশগ্রহণের ফি ১৩০ পাউন্ড এবং অনলাইনে অংশগ্রহণের ফি ৭০ পাউন্ড—অংশগ্রহণের ধরন অনুযায়ী ফি আলাদা। অনলাইনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্যও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

একটানা কয়েক দিনের কর্মসূচিও রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ থেকে ১৮ অক্টোবর নারীদের জন্য নিবিড় রিট্রিট এবং ৩০ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর ধ্যানের জন্য যোগ রিট্রিট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ২২ ডিসেম্বর থেকে পরের বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে শীতকালীন রিট্রিট। ১৬ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আরবান রিট্রিট ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।

আরবান রিট্রিট হলো কেন্দ্রটির শহরের মধ্যে অবস্থিত থাকার বাস্তবতাকে কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার একটি উদাহরণ। দূরে কোথাও না গিয়ে নিজের পরিচিত জীবনযাপনের পরিসরেই থেকে নির্দিষ্ট সময় ধরে সাধনার সূচি অনুসরণ করতে হয় এতে।

যাতায়াত ও যোগাযোগ

কেন্দ্রটির ঠিকানা ৫১ রোমান রোড, লন্ডন E2 0HU। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের বেথনাল গ্রিন স্টেশন থেকে হেঁটেই সেখানে পৌঁছানো যায়। ফোন: +44 (0)20 8981 1225, ইমেইল: contact@lbc.org.uk।

অফিসিয়াল ওয়েবসাইট londonbuddhistcentre.com। পুরোনো ঠিকানা lbc.org.uk-এ গেলে সেটি এই ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। সাপ্তাহিক ক্লাস, কোর্স ও রিট্রিটের সূচি ওয়েবসাইটের কর্মসূচি নির্দেশিকা পাতায় ধরন অনুযায়ী বেছে দেখা যায়। বিনা মূল্যের ক্লাসে বুকিং ছাড়াই যাওয়া যায়, তবে অর্থপ্রদানের কোর্স ও রিট্রিটের জন্য আগাম নিবন্ধন প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্য ভ্রমণকারী দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটকদের কাছে এই কেন্দ্রটির গুরুত্ব স্পষ্ট। এর জন্য কয়েক দিন আলাদা করে রাখতে হয় না। লন্ডন শহরে অবস্থানের সময় দুপুরের এক ঘণ্টা বা সন্ধ্যার দুই ঘণ্টা বের করলেই স্থানীয় সাধকদের সঙ্গে একই স্থানে ধ্যান করা যায়। একসময় ফায়ার স্টেশন থাকা ভবনের ইটের দেয়ালের ভেতরে অপরিচিত শহরের ব্যস্ত দিনটি সাময়িকভাবে শান্ত হয়ে আসার অভিজ্ঞতা নিজেই ভ্রমণের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।