
একবার চিকিৎসা নেওয়ার পরও কিছু কিশোর-কিশোরীর বিষণ্নতা পুরোপুরি কাটে না। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও কিংস কলেজ লন্ডনের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল এমন ১৫–১৮ বছর বয়সী ৪৮০ জন কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে বাবা-মায়ের জন্য একটি কোর্সসহ মাইন্ডফুলনেস কর্মসূচির র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা গত ২৩ অক্টোবর জার্নাল Trials-এ প্রকাশ করেছে। ট্রায়ালটির নাম ATTEND, আর কর্মসূচির নাম MAC (Mindfulness for Adolescents and Carers, কিশোর-কিশোরী ও পরিচর্যাকারীদের জন্য মাইন্ডফুলনেস)। এটি কার্যকারিতা যাচাইয়ের ফল নয়; বরং কীভাবে, কী মাপা হবে, তা আগেভাগে জানানো একটি গবেষণা-পরিকল্পনা।
যুক্তরাজ্যের ১৪ হাজার কিশোর চিকিৎসা নিয়েও সেরে ওঠে না
গবেষকদের নিবন্ধিত ট্রায়ালের বিবরণ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ১৫–১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী বিষণ্নতায় ভুগছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার জন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS)-এর অধীনে চিকিৎসা পায়। গবেষকদের ভাষ্য, প্রায় ১৪ হাজার জনের ক্ষেত্রে চিকিৎসায় সাড়া মেলে না, আর আরও প্রায় ৮ হাজার জনের প্রথম দফার চিকিৎসায় ভালো ফল হলেও বিষণ্নতা ফিরে আসার ঝুঁকি বেশি। গবেষকদের উদ্বেগ হলো, উপসর্গ থেকে যাওয়া কিশোর-কিশোরীদের আত্মক্ষতি, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং পড়াশোনা ও সম্পর্কে সমস্যার ঝুঁকি বেশি; প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও এতে প্রভাবিত হতে পারে।
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ঠিক এই কিশোর-কিশোরীদেরই খোঁজা হচ্ছে। বিষণ্নতা বা উদ্বেগের জন্য প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা অন্তত একবার শেষ করার পরও যাদের বিষণ্নতার উপসর্গ রয়ে গেছে বা আবার বেড়েছে, সেই ১৫–১৮ বছর বয়সীরা এর লক্ষ্য। গবেষকেরা ৪৮০ জনকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে দুই দলে ভাগ করবেন। এক দল প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি MAC পাবে, আর অন্য দল শুধু প্রচলিত চিকিৎসা চালিয়ে যাবে। লন্ডন, ডেভন, সাসেক্স, পূর্ব ইংল্যান্ড (কেমব্রিজ ও পিটারবরো), অক্সফোর্ড এবং নটিংহামের কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো এতে অংশ নিচ্ছে। গবেষণায় অর্থায়ন করছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ (NIHR)। আত্মহত্যার ঝুঁকি বা আত্মক্ষতি, খাওয়াদাওয়াসংক্রান্ত ব্যাধির জন্য বর্তমানে যেসব কিশোর-কিশোরী নিবিড় ব্যবস্থাপনায় রয়েছে, অথবা যাদের সাইকোসিস কিংবা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার আছে, তারা এতে অংশ নিতে পারবে না।

প্রাপ্তবয়স্কদের মাইন্ডফুলনেস কিশোরদের উপযোগী করে বাবা-মায়ের জন্য পাশের ঘরে ক্লাস
MAC-এর ভিত্তি হলো মাইন্ডফুলনেস-ভিত্তিক কগনিটিভ থেরাপি (MBCT)। ধ্যানচর্চা ও কগনিটিভ থেরাপির সমন্বয়ে তৈরি এই দলগত কর্মসূচিতে বিষণ্নতার প্রাথমিক লক্ষণ চিনতে এবং বিষণ্নতা বাড়ায় এমন চিন্তার পুনরাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে শেখানো হয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্স (NICE) বারবার বিষণ্নতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এ পদ্ধতির সুপারিশ করে। তবে গবেষকদের ভাষ্য, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এটি এখনো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়নি।
গবেষকেরা এই কোর্স কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী করে পরিবর্তন করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও কিংস কলেজ লন্ডনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, MAC সপ্তাহে একবার করে আট সপ্তাহ ধরে সরাসরি বা অনলাইন দলগত সেশনে পরিচালিত হবে। প্রতিটি সেশন হবে প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের। প্রাপ্তবয়স্কদের কোর্সের তুলনায় এতে শরীরচর্চামূলক বিরতির সময় বাড়ানো হয়েছে এবং কৌশল অনুশীলনের সময় কমানো হয়েছে। রাখা হয়েছে নাশতা ও কিশোর-কিশোরীদের ভালো লাগতে পারে এমন কার্যক্রমও। সেশনগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে পরিবার মিলে তৈরি একটি অ্যাপে বাড়িতে অনুশীলনের বিবরণ লেখা হবে। প্রশিক্ষিত পেশাদার প্রশিক্ষক প্রতি দলে ৬–১৪ জন কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে কাজ করবেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাবা-মা ও অভিভাবকদের জন্যও আলাদা কোর্স রয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের ক্লাস চলার সময় বাবা-মায়েরা অন্য একটি ঘরে আলাদা করে মাইন্ডফুলনেস কোর্স করবেন। এতে অংশ নেওয়া ঐচ্ছিক, তাই বাবা-মা চাইলে অংশ না নিলেও কিশোর-কিশোরীরা ট্রায়ালে অংশ নিতে পারবে। গবেষকেরা বলেছেন, বিষণ্নতায় আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীকে বড় করে তোলার প্রক্রিয়াটিই বড় চাপের, যা পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। যেসব পরিবারের বাবা বা মা বিষণ্নতায় ভোগেন, সেসব পরিবারের কিশোর-কিশোরীদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ার আশঙ্কাও বেশি। গবেষণাটির সহ-নেতৃত্বে থাকা কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক প্যাট্রিক স্মিথ বলেন, অনেক বাবা-মা সন্তানকে কীভাবে সাহায্য করবেন বুঝতে না পেরে কঠিন সময় পার করেন। বাবা-মায়ের কোর্সটি তাঁদের সন্তানের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া বুঝতে ও সহায়তা করতে কাজে লাগবে বলে তিনি আশা করেন।

১২ মাস ধরে প্রতি দুই সপ্তাহে মেজাজের পাশাপাশি বাবা-মায়ের মনও মাপা হবে
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কোন বিষয়কে কার্যকারিতা হিসেবে ধরা হবে, সেটিও আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান পরিমাপক হলো কিশোর-কিশোরীদের উত্তর দেওয়া সংক্ষিপ্ত মুড অ্যান্ড ফিলিংস প্রশ্নমালা (SMFQ)। দৈবচয়নে দলে ভাগ করার পর ১২ মাস ধরে প্রতি দুই সপ্তাহে এই প্রশ্নমালার উত্তর নেওয়া হবে। কোনো এক সময়ের স্কোর নয়, বরং এক বছরে বিষণ্নতা কতটা হালকা ছিল এবং কত অল্প সময় স্থায়ী হয়েছিল—দুই দলের মধ্যে তা তুলনা করা হবে। কারণ, বিষণ্নতা একবার কমে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসা ঠেকানোই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।
বাবা-মায়েরাও একই সময়ে প্রতি দুই সপ্তাহে বিষণ্নতা-সংক্রান্ত প্রশ্নমালা (PHQ-8) পূরণ করবেন। ট্রায়াল শুরুর সময়, প্রায় ১৪ সপ্তাহ পর এবং ১২ মাস পর কিশোর-কিশোরী ও বাবা-মা—উভয়ের উদ্বেগ, জীবনমান, জীবন সামলানোর সক্ষমতা এবং বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের মান আলাদাভাবে মাপা হবে। গবেষণা-পরিকল্পনায় থাকা সময়সূচিতে MAC-এ অংশগ্রহণকারীদের প্রতি সপ্তাহের মাইন্ডফুলনেস অনুশীলনের নথি এবং কোর্স শেষে কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর সাক্ষাৎকারও রয়েছে। অর্থাৎ, কারা এই কোর্স থেকে বেশি উপকৃত হয় এবং কতটা অনুশীলন ফলাফলের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত—তাও দেখা হবে।
খরচও হিসাব করা হবে। MAC প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে যোগ করলে কত খরচ হয় এবং কী সুফল মেলে, তা স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা ও সামগ্রিক সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে হিসাব করবেন গবেষকেরা। কর্মসূচি কার্যকর হলেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পক্ষে তা বহন করা সম্ভব কি না, সেটি দেখাতে হবে; তবেই NHS-এর সর্বত্র এর পরিসর বাড়ানো যেতে পারে। ট্রায়ালের নিবন্ধিত তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী নিয়োগের সময়সীমা ছিল আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত, আর পুরো গবেষণা শেষ হওয়ার কথা সেপ্টেম্বর ২০২৭-এ।


ফল এখনো আসেনি, তবু পরিবারের একসঙ্গে ধ্যানে নজর কেন
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল মাইন্ডফুলনেসের কার্যকারিতা প্রমাণ করেনি। ফল পেতে আরও সময় লাগবে, আর প্রত্যাশার বিপরীত ফলও আসতে পারে। যুক্তরাজ্যের আগে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলেম কাইখেনসহ অন্যরা ২০২২ সালে জার্নাল Evidence-Based Mental Health-এ প্রকাশিত MYRIAD গবেষণায় ৮৪টি স্কুলের ১১–১৪ বছর বয়সী ৮,৩৭৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা করেন। সব শিক্ষার্থীকে স্কুলে শেখানো মাইন্ডফুলনেস ক্লাস সাধারণ ক্লাসের চেয়ে মানসিক স্বাস্থ্য বেশি উন্নত করে—এমন প্রমাণ তাঁরা পাননি। এই ATTEND গবেষণা-পরিকল্পনাতেও অধ্যাপক কাইখেনের নাম লেখক হিসেবে রয়েছে।
ATTEND-এর লক্ষ্য আলাদা। সব শিশুকে একই ক্লাসে না বসিয়ে, চিকিৎসা নিয়েও যারা সমস্যায় আছে, তাদের বেছে নিয়ে প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে মাইন্ডফুলনেস যোগ করা হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের একা অনুশীলন করতে না দিয়ে বাবা-মাকে পাশের ঘরে রাখা হচ্ছে। ১৫ বছর বয়সে আট সপ্তাহের MBCT দলগত কোর্সে অংশ নেওয়া এবং বর্তমানে এই গবেষণায় রোগী ও নাগরিকদের অংশগ্রহণের নেতৃত্বে সহায়তাকারী ক্যাট নেলিস্ট কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে বলেছেন, এই কোর্স নেতিবাচক চিন্তা সামলাতে তাঁকে সাহায্য করেছে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও উন্নত হয়েছে।

তথ্য ও পর্দায় দিন কাটানো বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের কাছেও দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে থাকার ধ্যান শুরু থেকেই দূরের কিছু মনে হতে পারে। MAC-এ নড়াচড়ার বিরতি বাড়ানো এবং অনুশীলনকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করার বিষয়টি ধ্যানের পথে বাধা কমানোর একটি উপায় হিসেবে বিবেচনাযোগ্য। সন্তানের মনের সমস্যাকে শুধু তার নিজের দায় না ভেবে, বাবা-মায়ের মনকেও একসঙ্গে দেখভালের নকশাটি পারিবারিকভাবে ধ্যানের কথা ভাবছে—এমন দেশীয় ক্ষেত্রগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে এই কোর্স পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়; এটি চিকিৎসার পাশাপাশি দেওয়ার জন্য তৈরি। বিষণ্নতায় ভুগছে এমন কোনো শিশু থাকলে আগে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন। বাড়িতে বাবা-মা ও সন্তান প্রতিদিন কয়েক মিনিট হলেও নিজ নিজ শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ছোট অনুশীলন দিয়ে শুরু করতে পারেন। ২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের এই ট্রায়াল কী উত্তর দেয়, হিলিংনিউজও তা পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রবন্ধ-সংক্রান্ত যোগাযোগ: fare3041@naver.com
